কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার কিশোর ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার দোকানে বিনা বেতনে চাকরি নিয়েছিল বলে জানিয়েছেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিং অব কোটবাড়ি কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য বলেন, এক মাস আগে দোকানে চাকরি অবস্থায় তুহিন নেশা করার জন্য অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নেয়। তুহিনের সঙ্গে এক বছর ধরে অপ্রতিমের সম্পর্ক ছিল। নিয়মিত তাদের বাসায় পার্টির আয়োজন করতো। মোটরসাইকেল নিয়ে লালমাই পাহাড় এলাকায় তারা ঘুরতে যেত। স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের ‘কিং অব কোটবাড়ি’ গ্রুপের লিডার ছিল তুহিন। সে গ্রুপে নিয়মিত আড্ডা দিত অপ্রতিম—আমরা তা সবসময় দেখতাম। এই গ্রুপের দেখভাল করতো স্থানীয় এক বিএনপি নেতা। পার্টির কথা বলে তিনি মোটরসাইকেল মহড়ার আয়োজন করতেন।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে এই গ্রুপটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ‘কিং অব কোটবাড়ি’ ওই গ্রুপের একাধিক ছবিতে অপ্রতিমকে দেখা যায় এবং ওই গ্রুপের মোটরসাইকেলে মহড়াতেও তাকে দেখা যায়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির দুটি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পাওনা ৫ হাজার টাকা নিতেই তুহিনের সঙ্গে দেখা করে অপ্রতিম। এক পর্যায়ে টাকা দিবে বলে পাহাড়ের দিকে অপ্রতীমকে লালমাই পাহাড়ে দিকে নিয়ে যায় তুহিন। পরে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তুহিন টাকা দিতে পারবে না বলে অস্বীকৃতি জানালে অপ্রতীম তুহিনকে ধাক্কা দেয়। পরে তুহিন সেখানে বাঁশের লাঠি দিয়ে কয়েকবার মাথার পেছনে আঘাত করে। সেখানে তিন থেকে চারজন উপস্থিত ছিলো বলে জানা যায়।
ঘটনাস্থলেই অপ্রতিম আহত দেখে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন তার সহযোগীদের নিয়ে পালিয়ে যায়।
অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজির সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন। শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের সময় তুহিনসহ বাকি সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকারীদের নিয়ে একাধিক ভিডিও শেয়ার দেন।
অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তাকে হেফাজতে নেওয়ার সময় কর্মকর্তারা জানতেন না অপ্রতিম মারা গেছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ পাওয়ার খবর পান তারা।
তদন্তকারীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে অন্যদের নাম বলতে চাননি তিনি। অন্যদের নাম প্রকাশ না করতে তিনি ‘ওয়াদাবদ্ধ’ ছিলেন বলে জানিয়েছেন। এ সময় তার মোবাইল ফোনে বারবার ফোন আসছিল।
তার ফোনে কল করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোর। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এ সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট পরা ছিল। এরপর তুহিন আরেকজনের নাম জানালে তাকেও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আইফোনের নয়, মূলত ৫ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত এক কিশোর। তাকে ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সে টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, টাকা চাওয়ায় সে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল। সে বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না, এমন চিন্তা তৈরি হয় তার মধ্যে। এর জেরেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলেও ধারণা তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার কিশোর ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার দোকানে বিনা বেতনে চাকরি নিয়েছিল বলে জানিয়েছেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা।
একই সঙ্গে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার তথ্যও জানিয়েছেন তিনি। বিষয়গুলোর সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। তিনি বলেন, ম্যাডাম চান, পুলিশ তদন্ত করে বিষয়টি বের করুক এই প্রতিশোধের জেরেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ পাওয়া যায়। গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল সে। পরে শনিবার বেলা ১টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।






