চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী দেওয়ানেশ্বরী সার্বজনীন কালী মন্দির—যা স্থানীয়ভাবে ‘দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি’ নামে পরিচিত—দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কালীপূজা, শ্যামাপূজা, দীপাবলিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে প্রতিবছর এখানে ভক্তদের ব্যাপক সমাগম হয়।
তবে ঐতিহ্যবাহী এ মন্দিরের পরিচালনা কমিটি গঠন, দান-অনুদানের অর্থের হিসাব এবং ভক্তদের দেওয়া মূল্যবান স্বর্ণালংকারের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে ভক্তদের দান করা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও তালিকা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ করেছেন মন্দিরের কয়েকজন ভক্ত ও সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, মন্দিরে দান করা স্বর্ণালংকারের কতগুলো রয়েছে, সেগুলোর পৃথক ওজন কত, কে বা কারা দান করেছেন, বর্তমানে কোথায় সংরক্ষিত আছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সাধারণ ভক্তদের সামনে কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
শুধু স্বর্ণালংকার নয়, মন্দিরের উন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রমের নামে সংগৃহীত অর্থের রসিদ বই, আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করার অভিযোগ
মন্দির পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। ভক্তদের দাবি, মন্দিরের প্রচলিত গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বর্তমান পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্দিরের গঠনতন্ত্রে ৩৫ সদস্যের পরিচালনা কমিটির বিধান থাকলেও বর্তমানে ৪১ সদস্যের কমিটি রয়েছে। কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভক্তরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং বর্তমান কমিটির বৈধতা কী—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বর্ণালংকারের হিসাব প্রকাশের দাবি
মন্দিরের সাধারণ ভক্তদের পক্ষ থেকে দান করা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিটি স্বর্ণালংকারের ওজন, দাতার পরিচয়, দানের সময়, সংরক্ষণস্থল, ব্যবহারের ইতিহাস এবং বর্তমানে সেগুলোর অবস্থান সম্পর্কে লিখিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভক্তদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মানুষের দান করা অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। এ জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি মন্দিরের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং স্বর্ণালংকারের তালিকা স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।
যা বলছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির কর্মকর্তারা
অভিযোগের বিষয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দাস গুপ্তের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়া মন্দিরের স্বর্ণালংকার দেখাতে পারবেন না।”
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক অমল কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে স্বর্ণালংকারের হিসাব ও অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।”
তবে কমিটি গঠনের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ, ৩৫ সদস্যের পরিবর্তে ৪১ সদস্যের কমিটি করার কারণ এবং মন্দিরের আয়-ব্যয়ের নথিপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মন্দিরের ভক্ত ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মন্দিরের গঠনতন্ত্র, কমিটি গঠনের নথি, দান-অনুদানের রসিদ, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং স্বর্ণালংকারের তালিকা যাচাই করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এতে একদিকে যেমন ভক্তদের মধ্যে আস্থা ফিরবে, অন্যদিকে মন্দিরের ঐতিহ্য, ধর্মীয় পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতিও অক্ষুণ্ন থাকবে।
(চলবে—২য় পর্ব)