1. nerobtuner@gmail.com : শ্যামল বাংলা : শ্যামল বাংলা
  2. omarfarukbd12@gmail.com : শ্যামল বাংলা : শ্যামল বাংলা
  3. info@shamolbangla.net : শ্যামল বাংলা : শ্যামল বাংলা
চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ড যেন মৃত্যুকূপ ৯ বছরে ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু, নিরাপত্তা তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগ - দৈনিক শ্যামল বাংলা
মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম:
নোয়াখালীতে চট্টগ্রাম অঞ্চল উপযোগী বিনা উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আঞ্চলিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ড যেন মৃত্যুকূপ ৯ বছরে ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু, নিরাপত্তা তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগ মাগুরার শ্রীপুরে কালবের উদ্যোগে মিউচ্যুয়াল এইড সার্ভিসেস ও লাইফ সেভিংসের বেনিফিট প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নিখোঁজের একদিন পর বাড়ির সামনের পুকুর থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার  মাগুরার শ্রীপুরে কালবের উদ্যোগে মিউচ্যুয়াল এইড সার্ভিসেস ও লাইফ সেভিংসের বেনিফিট প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত নকলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী মিথ্যা মামলায় ৩ বিএনপি নেতার সাজা বাতিল ও মুক্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন  আনোয়ারায় একই চেয়ারে তিন বছরের বেশি মৎস্য কর্মকর্তা, ৭,৭৪৪ মৎস্যজীবীর তালিকা যাচাই ও প্রকাশের দাবি কুমিল্লায় প্রাডো গাড়িতে ৩ লাখ পিস ইয়াবা, আটক ২ বাংলাদেশে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তার আশ্বাস এডিবির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তহীন পথ চলছে সরকার : মাহদী আমিন

চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ড যেন মৃত্যুকূপ ৯ বছরে ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু, নিরাপত্তা তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক , চট্টগ্রাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো যেন একের পর এক মৃত্যুর মঞ্চ। শ্রমিকের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বিধিনিষেধ—কাগজে-কলমে নানা নিয়ম থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। এরই মধ্যে গত শুক্রবার ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একসঙ্গে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে।

 

বেসরকারি সংস্থা লেবার রিসোর্স সাপোর্ট সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডে কাজ করতে গিয়ে ১২২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮, ২০১৭ সালে ১৯, ২০১৮ সালে ১৩, ২০১৯ সালে ২৩, ২০২০ সালে ১০, ২০২১ সালে ৯, ২০২২ সালে ৭ এবং ২০২৩ সালে ৭ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় একজন, ২০২৫ সালে চারজন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। সবশেষ ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় আরও ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হওয়ায় গত এক দশকের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

 

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন, তদারকির দুর্বলতা এবং দুর্ঘটনার পর জবাবদিহির ঘাটতির কারণেই মৃত্যুর এই মিছিল থামছে না। বাংলাদেশ সংহতি ফেডারেশন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি রুপন চৌধুরী বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘন করে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়োগ ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কাজ করানো হয়। ফলে প্রতিবছরই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় তা গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি ক্ষতিপূরণ ও আইনি জটিলতা এড়াতে লাশ গুম বা সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।

 

দুর্ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করা শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান নেই। আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারানো অনেক শ্রমিক পরবর্তী সময়ে পরিবার চালাতে গিয়ে চরম সংকটে পড়ছেন বলে শ্রমিক-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্রিন ও সাধারণ—দুই ধরনের ইয়ার্ডেই অনেক সময় সরাসরি শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে জাহাজ কাটার কাজ ঠিকাদারের মাধ্যমে করানো হয়। ঠিকাদার আবার সাব-ঠিকাদার নিয়োগ করেন। দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে অনেক সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে মালিকপক্ষ, ঠিকাদার ও শ্রমিকের মধ্যে দায়িত্বের সীমারেখাও অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

 

শ্রমিকদের অভিযোগ, রাত ৮টার পর জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও অনেক ইয়ার্ডে তা যথাযথভাবে মানা হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত ও নিষ্কাশন, অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।

 

এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ ফেরদৌস স্টিল। ছয় মাস আগে সরকারি পরিদর্শনেই ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় একাধিক অনিয়ম ধরা পড়েছিল। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি নিশ্চিত না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া, নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করানো এবং ওভারটাইমের অর্থ না দেওয়ার মতো অভিযোগ পেয়েছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

 

চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে গত ১৫ জুলাই ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। তবে শ্রম আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে মামলার কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। ফলে মামলা দায়েরের তথ্য ও আদালতের নথির মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে, সেটিও যাচাইয়ের দাবি রাখে।

 

শুধু একটি ইয়ার্ড নয়, পুরো শিল্পের কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায় ৩৫টি শিপইয়ার্ড সচল রয়েছে। এর মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ড মাত্র চারটি। আরও কয়েকটি ইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডের স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অথচ একসময় এই উপকূলে ১৫০টিরও বেশি ইয়ার্ড ছিল। নানা সংকট ও বিধিনিষেধের কারণে এর মধ্যে প্রায় ১২০টি ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা পুরোনো জাহাজ এসব ইয়ার্ডে কেটে পাওয়া লোহা-ইস্পাত রড তৈরির কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পে সরবরাহ করা হয়।

 

ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনার পর অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার জাহাজভাঙা শিল্পে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ বা পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড নিশ্চিত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে পরিদর্শনও চলছে। হংকং কনভেনশনের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করেই গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ দেওয়া হয়। তবে নিয়ম মানার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি বা অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

 

কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, গ্রিন ইয়ার্ডের স্বীকৃতি থাকলেই যদি শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে গ্রিন ও সাধারণ ইয়ার্ডের পার্থক্য কোথায়? শিপ ব্লেকিং ইয়ার্ড শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ বলেন, ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে পরিচিত কোনো ইয়ার্ডেও যদি নিয়ম-কানুন না মেনে জাহাজ কাটা হয়, তাহলে সাধারণ ও গ্রিন শিপইয়ার্ডের মধ্যে পার্থক্য কী থাকল—এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

 

তিনি বলেন, শিপইয়ার্ডে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। জীবিকার তাগিদে শ্রম বিক্রি করতে আসা মানুষগুলোর অনিরাপদ মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

 

ফেরদৌস স্টিলের ৯ শ্রমিকের মৃত্যু তাই শুধু একটি ইয়ার্ডের দুর্ঘটনা নয়; এটি চট্টগ্রামের পুরো শিপ ব্রেকিং শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সরকারি তদারকি, ঠিকাদারি কাঠামো এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পরও যদি একই ধরনের অনিয়ম ফিরে আসে, তাহলে নিয়ম ও সনদের পাশাপাশি বাস্তবে শ্রমিকের জীবন কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

মন্তব্য করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2025 sweb.net
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় sweb.net