নমুনা পরীক্ষা করছে পরিবেশ অধিদপ্তর, তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নে দোহাজারী–কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি-মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ নিয়ে পরিবেশদূষণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কেন্দ্রের একটি ড্রেন দিয়ে কালচে তৈলাক্ত বর্জ্য মইল্ল্যা খালে পড়ছে। জোয়ারের পানিতে তা সাঙ্গু নদী হয়ে ডলু খাল, হাঙর খালসহ আশপাশের শাখা-উপশাখা খালে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কৃষিজমি, মাছ ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
বিষয়টি তদন্তে পরিবেশ অধিদপ্তর পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষও তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দূষণের উৎস, রাসায়নিক উপাদান, মাত্রা ও ক্ষতির পরিমাণ পরীক্ষার ফল ছাড়া নিশ্চিত নয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশের ড্রেন দিয়ে কালচে তৈলাক্ত পদার্থ মইল্ল্যা খালে যাচ্ছে। জোয়ারের পানিতে তা সাঙ্গু নদী হয়ে ডলু খাল, হাঙর খালসহ বিভিন্ন শাখা-উপশাখায় ছড়িয়েছে।
সরেজমিনে ড্রেন দিয়ে কালচে তৈলাক্ত পদার্থ খালের দিকে যেতে দেখা গেছে। খালের পানিতে কালচে আস্তরণ ও উদ্ভিদের ক্ষতির চিত্রও দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, এতে মাছ কমে গেছে এবং ঘাসসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মইল্ল্যা খালের পানি কালিয়াইশ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কৃষকেরা সেচে ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তৈলাক্ত বর্জ্যের কারণে তাঁরা সেচ দিতে পারছেন না। এর প্রভাব কালিয়াইশ ছাড়িয়ে নলুয়া, আমিলাইষ, খাগরিয়া, বৈলতলী ও চরতি এলাকাতেও পড়েছে।
কৃষক নুর হোসেন বলেন, “ফসলি জমিতে সেচ দিতে পারছি না। ফসল মারা যাওয়ার ভয় হচ্ছে।”
জেলে মতিলাল ও স্বপন দাশ বলেন, “পানিতে পোড়া তেল ছড়িয়ে পড়ায় মাছ পাওয়া কঠিন হয়েছে। জাল ফেলতে গিয়ে হাতে-পায়ে তেল লেগে শরীরে সমস্যা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, তৈলাক্ত পদার্থ সাঙ্গু নদী ও শাখা-উপশাখা খালে ছড়িয়ে পড়লে জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দোহাজারী–কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কিছু পানি-মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ খালে মিশে থাকতে পারে। তা দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ব্যবহারের পর স্লাজ নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করে প্রতিবছর নিলামে বিক্রি করা হয়। তাই স্লাজ ফেলে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। খালে স্লাজ কীভাবে গেছে, তা তদন্ত ও নমুনা পরীক্ষার আগে বলা সম্ভব নয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, অধিদপ্তরের একজন পরিদর্শক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দূষিত স্থান পরিদর্শন করে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন। নমুনা সংগ্রহ করা হলেও দূষণের রাসায়নিক উপাদান, মাত্রা, উৎস ও ক্ষতির পরিমাণ পরীক্ষার ফল ছাড়া জানা যায়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ফার্নেস অয়েল স্লাজ পানিতে মিশলে জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ, মাটি ও কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দূষণের উৎস দ্রুত শনাক্ত করে বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে স্লাজ খাল বা নদীতে না মেশার ব্যবস্থা করা জরুরি।
তবে এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত। বাস্তব ক্ষতির মাত্রা পরীক্ষার ফল ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
সাঙ্গু নদী ও আশপাশের খালে তৈলাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে ড্রেন ও খালে কালচে তৈলাক্ত পদার্থ দেখা গেলেও দূষণের উৎস ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা দূষণের উৎস শনাক্ত, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং নদী-খালে দূষণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।