নিউজ করায় প্রতিবেদককে অপহরণ-হত্যা ও লাশ গুমের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ
রাজধানীর মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মোবাইল কোর্টের অভিযানের পরও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি ভবনে পুনরায় নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভবন মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে রাজউক। একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভবনটির নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে ভবন মালিকের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রতিবেদকের দাবি, ভবন মালিক কাউসারের শ্বশুর তার অফিসে এসে সংবাদ প্রকাশ করলে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো, অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের মতো ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর কথাও বলা হয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিবেদকের।
ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাজধানীতে অনুমোদিত নকশা বাস্তবায়নে রাজউকের কার্যকর নজরদারি—দুই বিষয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজউকের অভিযানের পরও নির্মাণকাজ
রাজউক সূত্রে জানা যায়, মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় পর্বের প্লট নং-৩৪, রোড নং-এন-৫, ব্লক-এইচ এলাকায় ভবনটির নির্মাণকাজ চলছিল। অনুমোদিত নকশার সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবনের অসঙ্গতি পাওয়ার পর গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে রাজউক।
অভিযানের সময় ভবনের নকশাবহির্ভূত কিছু অংশ ভেঙে অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে অবশিষ্ট ব্যত্যয়কৃত অংশ নিজ দায়িত্বে অপসারণ করার বিষয়ে প্লট মালিকের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নকশাবহির্ভূত অংশ পুরোপুরি অপসারণ না করে সেখানে পুনরায় নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজউক বিষয়টি নিয়ে প্লট মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
সাত দিনের মধ্যে জবাব চেয়েছে রাজউক
রাজউকের ১০ জুন ২০২৬ তারিখের নোটিশে অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণকাজ চালানোকে প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়কৃত অংশ সম্পূর্ণ অপসারণ না করে কেন পুনরায় নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে প্লট মালিককে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভবনটির সব ধরনের নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ এবং ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করা হলে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।
নকশার ব্যত্যয়ে শাস্তির বিধান
অনুমোদিত নকশা ছাড়া অথবা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-তে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধরনের নির্মাণকে আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট আইনের আওতাভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নগর উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনগত কাঠামোও এসেছে। নতুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ অনুমোদিত নকশার বাইরে স্থাপনা নির্মাণের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নতুন বিধানে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
নকশাবহির্ভূত ভবন নিয়ে রাজউকের কঠোর অবস্থান
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে অনুমোদিত নকশা ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে ভবন নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রাজউক এলাকায় নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণাধীন বহু ভবন চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নকশাবহির্ভূত নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজ চলাকালীন নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অংশ ভেঙে দেওয়ার পর যদি একই স্থানে আবার নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
এদিকে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিবেদককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ঘটনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন মালিক কাউসারের শ্বশুর তার অফিসে এসে সংবাদ প্রকাশ না করতে চাপ দেন। সংবাদ প্রকাশ বা বিষয়টি নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি’ করলে প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলা করার পাশাপাশি তাকে অপহরণ ও হত্যার পর লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদকের আরও অভিযোগ, তাকে পথে-ঘাটে চলাচলের সময় তুলে নেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তার করানো এবং সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মতো কথাও বলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ভবন মালিক বা তার পরিবারের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে হুমকির বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা নিরূপণ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজউকের মোবাইল কোর্টের অভিযানের পর একই স্থানে আবার নকশাবহির্ভূত নির্মাণ শুরু হলে শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্যে ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ না রেখে আইনের আওতায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, রাজধানীতে অনুমোদিত নকশা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে রাজউককে নিয়মিত তদারকি, নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ কার্যকর করা, প্রয়োজনীয়