ছাত্রী হোস্টেল হলো এমন একটি আবাসিক ব্যবস্থা, যেখানে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বা কর্মজীবী নারীরা নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে নিরাপদে বসবাস করেন। নিজের পরিবারের বাইরে দূর-দূরান্তে পড়াশোনা বা চাকরির সুবাদে নারীদের জন্য এই ধরনের আবাসন অত্যন্ত উপযোগী।
শিক্ষা জীবনের শুরুতে একটি সাশ্রয়ী আবাসনের প্রয়োজনীয়তা থাকে সবার। তবে একজন ছাত্রর চেয়ে ছাত্রীর জন্য সুবিধাজনক হোস্টেল বা ম্যাস পাওয়া কঠিন। শহরের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারীদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ছাত্রী হোস্টেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উচ্চশিক্ষার জন্য শহরমুখী হওয়া হাজারো তরুণীর কাছে ছাত্রী হোস্টেল হলো এক টুকরো নির্ভরতা ও স্বপ্নবুননের প্রথম ঠিকানা।
ছাত্রী হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা ও ক্যারিয়ারে সফল হয়েছেন—এমন অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চারপাশেই আছে। অনেকেই মনে করেন হোস্টেল জীবন শুধু কষ্টের, কিন্তু সঠিক মানসিকতা থাকলে এই জীবনটাই সফলতার সবচেয়ে বড় সিঁড়ি হতে পারে।
হোস্টেল জীবন কীভাবে ছাত্রীদের সফল হতে সাহায্য করে, হোস্টেলে একা থাকার কারণে নিজের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়। নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস তৈরি হয়। সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা যায়। আর্থিক হিসাব ও বাজেট ম্যানেজমেন্ট শেখা হয়। গ্রুপ স্টাডি ও মেধার বিকাশ হয়।সহপাঠীদের সাথে গ্রুপ স্টাডি করার সুবিধা থাকে।পড়াশোনার যেকোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিক সাহায্য পাওয়া যায়।অন্যদের ভালো ফল দেখে নিজের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। নেটওয়ার্কিং ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন জেলা ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে থাকার অভিজ্ঞতা হয়।মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং ধৈর্য বাড়ে।ভবিষ্যতে ক্যারিয়ারে কাজে লাগার মতো চমৎকার একটি ফ্রেন্ড সার্কেল বা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। শৃঙ্খলিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। হোস্টেলের নির্দিষ্ট নিয়ম ও রুটিন মেনে চলতে হয়। সকালের নাশতা, পড়াশোনা ও ঘুমের একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা তৈরি হয়।
ছাত্রী হোস্টেল যেমন রয়েছে সুবিধা ঠিক রয়েছে অসুবিধা। দেশের বিভিন্ন শহরে অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছাত্রী হোস্টেল, যার বড় একটা অংশেরই সঠিক প্রশাসনিক অনুমোদন বা নিয়মনীতির বালাই নেই। প্রয়োজনের তুলনায় সিট কম থাকায় ১০ জনের রুমে ১৮ থেকে ২০ জন ছাত্রীকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। শিক্ষার্থাদের জিম্মি করে অনেক সময় চড়া ভাড়া আদায় করা হয়, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় অংকের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।অনেক হোস্টেলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকির অভাব রয়েছে, যা অভিভাবকদের সবসময় উৎকণ্ঠায় রাখে। অস্বাস্থ্যকর মানহীন পরিবেশ, নামমাত্র খাবার এবং বাথরুমে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
আমি মনে করি সুবিধা ও অসুবিধার উত্তরণের উপায় বের করতে হবে আমাদেরকে। ছাত্রী হোস্টেলগুলোকে নিয়মনীতির আওতায় আনতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি বা নজরদারি বাড়াতে হবে সরকারকে।ভাড়ার হার এবং সুযোগ-সুবিধাগুলোর একটি যৌক্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
বাড়ি থেকে দূরে থাকার একাকিত্ব বা কষ্টকে যারা পড়ালেখার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, তারাই দিনশেষে সফল হয়। বাংলাদেশের বিসিএস ক্যাডার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, করপোরেট লিডার থেকে শুরু করে উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশই তাদের জীবনের বেশ কিছু সময় হোস্টেলে কাটিয়েছেন।
লেখক, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।