এখনই অবসরের কথা ভাবছেন না রোনালদো, লক্ষ্য ১ হাজার গোল
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক কে বিদায় জানানোর কথা ভেবেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন পর্তুগিজ তারকা।
জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ক্লাব ও দেশের হয়ে ক্যারিয়ারে ১ হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্যও ধরে রেখেছেন তিনি।
রোনালদোর হাজার গোল পূর্ণ করতে আর প্রয়োজন ২১টি গোল।
সমালোচকদের কেউ কেউ তাকে ‘শেষ করে দিতে’ চাইলেও সেসব নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না ৪১ বছর বয়সী এই তারকা। বরং নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতেই মনোযোগ দিতে চান তিনি।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৩ ম্যাচ খেলা রোনালদো সর্বশেষ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল।
বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন কি না, জানতে চাইলে রোনালদো বলেন, ‘হ্যাঁ, ভেবেছিলাম। অবশ্যই। আমি সবসময় আমার সিদ্ধান্ত, ভবিষ্যৎ, এমনকি বর্তমান নিয়েও ভাবি। আমি চিন্তাশীল মানুষ, তাই ভাবতে হয়। এ কারণেই এখন আমাকে এখানে দেখছেন, এর মানে আমি চালিয়ে যাব।’
পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো ও নতুন কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে বলেও জানান রোনালদো। জাতীয় দলকে এখনও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে পারবেন বলে বিশ্বাস তার।
‘আমি এখনও বিশ্বাস করি, জাতীয় দলকে তাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারি। শুধু গোল করে নয়, মাঠের বাইরেও দলকে সমর্থন দিতে পারি। নতুন একটি তরুণ প্রজন্ম আসছে। তবে আমার কাছে মূল বিষয় হলো মাঠে থেকে গোল করা এবং দলকে ম্যাচ জিততে সাহায্য করা।’
জাতীয় দলের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে নিজে থেকেই সরে যাবেন বলেও পরিষ্কার করেছেন রোনালদো। তার ভাষায়, ‘যেদিন তারা বলবে জাতীয় দলে আমাকে চায় না, সেদিন আমিই প্রথম চলে যাব। যখন মনে হবে আমি দলের জন্য কিছু যোগ করতে পারছি না কিংবা কোনো পরিবেশ তৈরি করছি, তখনও আমিই প্রথম চলে যাব। ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাব। পর্তুগিজরা আমার ওপর আস্থা রাখে। সে কারণেই আমি এখনও এখানে।’
‘শুধু সংখ্যাগুলোর দিকে তাকান, কিছু হিসাব নিশ্চয়ই করতে পারবেন। আমি এখনও ভালো করছি। যেদিন তারা আমার ওপর আস্থা রাখবে না, কোনো সমস্যা নেই, আমি চলে যাব। আমি সবসময় এই ফেডারেশনের এক নম্বর সমর্থক থাকব।’
এদিকে রোনালদোর সাবেক ক্লাব কোচ জেসুস পর্তুগাল জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ম্যাচেই তাকে খেলানোর কথা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার নেশন্স লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের কোচ হিসেবে অভিষেক হবে জেসুসের। রবার্তো মার্তিনেজের স্থলাভিষিক্ত হওয়া এই কোচ রোনালদোর পাশে দাঁড়িয়ে তার প্রশংসাও করেন।
জেসুস বলেন, ‘রোনালদো পর্তুগাল ও জাতীয় দলের একটি প্রতীক। সে ম্যাচ খেলবে কি না, সেটি নিয়ে তার কোনো এখতিয়ার নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি কোচের।’
পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের ক্যাম্পাসে জেসুসের পাশে বসে বেশ স্বচ্ছন্দই ছিলেন রোনালদো। নিজের ক্যারিয়ার ও সমালোচনা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
‘আমি জানি আমি কে। এখানে থাকতে কী করেছি, যে সাফল্য পেয়েছি তা অর্জনের জন্য কী করেছি, সবই জানি। আমি জানি কেন তরুণরা আমাকে ভালোবাসে। তারা আমাকে উদাহরণ হিসেবে দেখে। অবসর নেওয়ার পরও, এমনকি ১০ বছর পরও, আমি সেটাই করে যেতে চাই।’
সমালোচকদের নিয়েও খুব বেশি মাথা ঘামাতে চান না রোনালদো। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের সঙ্গে খুশি। কাল খেলব কি না, কিংবা পরের ম্যাচের জন্য বিশ্রামে থাকব কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি যেন ভালো অনুভব করি। আমার আশপাশের মানুষ আমার কাজের ওপর আস্থা রাখে। যারা আমাকে ভালোবাসে, তাদের দিকে মনোযোগ দিন, যারা সমালোচনা করে তাদের নয়। এ কারণেই আমি সুখী মানুষ।’
সমালোচনা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে রোনালদোর উত্তরেও ছিল রসিকতার ছাপ। তিনি বলেন, ‘আমি শতভাগ সৎ হতে পারি না, মাঝে মাঝে রাজনৈতিকভাবে সঠিক থাকতে হয়।’
এরপরই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি কিছু টেলিভিশন চ্যানেল আমাকে সমালোচনা করতে পছন্দ করে। তারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছে, শটগান দিয়ে। কিন্তু আমি এখনও সেখান থেকে সরে যেতে পারি। যাই হোক, আমি এতে অভ্যস্ত। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তাই বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেটাই করব। আর যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, সেটা নিয়ে ভাবব না।’
বৃহস্পতিবার পর্তুগালের হয়ে জোসে আলভালাদে স্টেডিয়ামে ফিরবেন রোনালদো। এই মাঠেই স্পোর্টিংয়ের হয়ে তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু। ২০০৩ সালে সেখান থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন তিনি।
দীর্ঘ সময় পর লিসবনে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচটিও তাই রোনালদোর জন্য বিশেষ। সর্বশেষ গত অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডকে হারানোর পর এই শহরে জাতীয় দলের ম্যাচ হয়নি।
‘এটি বিশেষ অনুভূতি। কারণ এখানেই আমার সুন্দর গল্পের শুরু হয়েছিল। এত বছর পর জাতীয় দলের হয়ে এমন একটি জায়গায় খেলতে পারা নিয়ে আমি খুব গর্বিত, যেখানে কার্যত পুরো বিশ্বের সামনে আমার পথচলা শুরু হয়েছিল। এটি ছিল অসাধারণ একটি মুহূর্ত।’
‘জাতীয় দলের হয়ে খেলতে, পর্তুগালের রং ধারণ করতে সবসময়ই ভালো লাগে। এত বছর পরও প্রতিবারই মনে হয় যেন প্রথমবার। আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে মাঠে নামব। আশা করি আমরা ভালোভাবে শুরু করতে পারব। আর যেহেতু এটি স্পোর্টিংয়ের মাঠ, তাই অনুভূতিটা একটু বেশিই বিশেষ।’
ক্যারিয়ারে ১ হাজার গোলের মাইলফলক নিয়েও নিজের ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন রোনালদো। পর্তুগালের জার্সিতে সেই গোল করতে পারলে সেটিই হবে তার কাছে ‘কেকের ওপর চেরি’।
‘জাতীয় দলের হয়ে আমার ১ হাজারতম গোল করতে পারলে সেটি হবে কেকের ওপর চেরি। এটি একটি সুন্দর গল্পের পরিপূর্ণতা হবে। আমি বলেছিলাম, এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই এবং আমি সেখানে পৌঁছাব। তবে এটি নিয়ে আমার কোনো আবেশ নেই। কোনো কিছু নিয়ে অতিরিক্ত আবিষ্ট থাকলে সেটি পাওয়া যায় না। উপভোগ করুন।’